ঘুরে যে দাঁড়াতেই হবে

0

বিশ্বকাপ নাটকীয় গতিতে চলতেই ভালোবাসে। সকালে রাজা তো বিকালেই আপনি ফকির! মাঝে মাঝে সব সরলরেখায়ও চলে বৈকি। নির্মমতাও কম থাকে না। প্রত্যাশার চাপে থাকা বাংলাদেশ ইতিহাসে তাদের শ্রেষ্ঠ দল নিয়েই বিশ্বকাপে এসেছে। আজ টনটনে এমন এক ম্যাচ, যেখানে ওয়ানডে ক্রিকেটে দুইবারের চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও বাংলাদেশ এক রেখায় দাঁড়িয়ে।

ম্যাচটি জিতে গেলে, সব ঠিক আছে! হেরে গেলে শুধু কাগজেই টিকে থাকবে বাংলাদেশ। যে কোনো টুর্নামেন্টেই সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, সঠিক কাজ করা ও সঠিক সময়ে জ্বলে ওঠাটাই মূলকথা। দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন বাড়িয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ। সকাল দেখলে পুরো দিন দেখা যায় যারা বিশ্বাস করেন, তাদের জন্য দুঃস্বপ্ন নিউজিল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের ম্যাচটি। শ্রীলংকার ম্যাচ যখন প্রকৃতি বৃষ্টি ঝরিয়ে শেষ করে দেয়, তখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অবস্থা মাশরাফিদের। ক্রিকেট ইতিহাসে দেয়ালে পিঠ ঠেকা বাঘখ্যাত হচ্ছে পাকিস্তান।

বাংলাদেশের এখন সময় এই তকমা নেওয়ার। দেয়ালে পিঠ ঠেকা বাঘ সব সময়ই ভয়ঙ্কর। রেখার কথায় আসা যাক। র‌্যাংকিংয়ে ৭ নম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। পরের অবস্থানটি বাংলাদেশের। এ বিশ্বকাপে ৪ ম্যাচ থেকে সমান ৩ পয়েন্ট দুদলের। আবার এমন একটি ম্যাচের সামনে তারা দাঁড়িয়ে, যেটা হেরে গেলে শেষ চারের স্বপ্ন মলিন-ধূসর হয়ে যাবে। এমন এক পরিস্থিতিতে শুধু আশা ইতিহাস। বিশ্বকাপে ৪ ম্যাচের তিনটিতে জিতেছে ক্যারিবীয়রা (১টি ম্যাচ ফলশূন্য)। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে কখনো ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে জেতেনি।

২০১১ সালের বিশ্বকাপে (মিরপুরে) বাংলাদেশ মাত্র ৫৮ রানে অলআউট হয়েছিল। সে ম্যাচ ক্যারিবীয়রা ৯ উইকেটে জেতে। ২০১৫ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সাথে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দেখা হয়নি। এদিকে আবার বাংলাদেশের আশার কারণ সর্বশেষ রেকর্ড। ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে সর্বশেষ ৯ ম্যাচের ৭টিতে জয় বাংলাদেশের। আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। এ ছাড়া দুটি সিরিজেও জয় রয়েছে। সব মিলিয়ে সেই বাংলাদেশ নেই এখন। ২০১১ সালের ওই ম্যাচে গেইল ছিলেন। এই ম্যাচেও আছেন।

অবশ্য সেই গেইল আর এই গেইলের কোনো তফাত নেই। দুটি দল আরও একটি রেখায় মিলে গেছে। এই টনটনে বাংলাদেশ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ কখনই খেলেনি। এখানে আন্তর্জাতিক ম্যাচ হয়েছেই ৫টি। তার আবার দুটি এই বিশ্বকাপে। পেসারদের সুখবর হচ্ছে, আগের দুটি ম্যাচে ৩০টি উইকেট ফাস্ট বোলাররা নিয়েছেন। আর দুটি উইকেট পেয়েছেন স্পিনাররা। মাশরাফি আরেকজন পেসার নেবেন কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়। রুবেল হোসেন ও আবু জায়েদ রাহীর হাতে তো মাকড়সার জাল বিস্তার করতে পারে! মাশরাফির মনোভাব বোঝা কঠিন।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের টপ অর্ডারে ৪ জন বাঁ-হাতি। অফ স্পিনার রাখার পক্ষে মাশরাফি। তিনি কাল বলেছেন, ‘দলের ৪ নম্বর পেসার আসবে কিনা সেটা এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। উইকেটে ঘাস আছে আবার মাঠ ছোট ঠিক আছে। তবে মাঠ ছোট হওয়ায় আমাদের জন্য বরং ভালো। আর দল নিয়ে ম্যানেজমেন্ট বসবে। আমি ম্যানেজমেন্টের অংশ হলেও সবার কথা আমার শুনতে হয়। ব্যাটসম্যান কমিয়ে বোলার আনলে সব সময় ফল ভালো আসেও না।’ ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে ইনজুরির শঙ্কা রয়েছে। আন্দ্রে রাসেল এখনো নিশ্চিত নন। তার ব্যাপারে আজ সকালে সিদ্ধান্ত হবে।

এভিন লুইস কাল নেটে ব্যাট করার সময় আঘাত পান। তবে লুইস ভালো আছেন। টনটনের মাঠ ছোট। বাঁ-হাতি ওপেনার সৌরভ গাঙ্গুলী এই মাঠে সেঞ্চুরি করেছিলেন। ওয়ার্নারও শতক হাঁকিয়েছেন। গেইল ও তামিম ইকবাল এই টুর্নামেন্টে এখনো ঝড় হয়ে দেখা দেননি। ছক্কা বৃষ্টির আশা করাই যায়। তবে মাশরাফি মনে করেন, ‘মাঠ ছোট হওয়ায় ভালো হয়েছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের খেলোয়াড়রা সব মাঠেই বড় শট নিতে পারে। আমাদের ব্যাটসম্যানরাও সুযোগ পাবে। আবার এটাও ভাবতে হবে বেশি আগ্রাসী খেলতে গেলে ওরা উইকেটও হারাতে পারে। আমরা এই সুবিধাটা নেব।’

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের টিকে থাকতে হলে এই জয়ের বিকল্প নেই। পরের ম্যাচগুলো তো অস্ট্রেলিয়া, আফগানিস্তান, ভারত ও পাকিস্তানের সাথে। ৪টি দলের তিনটিই সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। ফলে বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই এখান থেকেই হোক শুরু। বাংলাদেশের প্রথম না ওয়েস্ট ইন্ডিজের চতুর্থ বাংলাদেশ বিশ্বকাপে কখনই জেতেনি ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ আগের ৪ ম্যাচের ৩টিতে জিতেছে। একটি ফলশূন্য ছিল।

বাংলাদেশ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথমবারের মতো এ মাঠে খেলছে। এবার পারবেন কি তামিম-মাশরাফি! টনটনের উইকেটে সৌরভ গাঙ্গুলি ও ডেভিড ওয়ার্নারের সেঞ্চুরি রয়েছে। দুজনই বাঁহাতি ওপেনার। তামিম ইকবাল তিন ম্যাচ থেকে রান তুলতে পারেননি। এবার কি তবে তামিমের দিন? হাতের উল্টো পিঠও আছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য রয়েছে আবার ক্রিস গেইল। এই মাঠে পেসাররা সফল। উইকেটে ঘাস আছে।

মাশরাফি আগের ৩ ম্যাচে ১টি উইকেট নিয়েছেন। পেসারদের স্বর্গে কি তিনি ঘুরে দাঁড়িয়ে সমালোচনার জবাব দেবেন? এখানে পেসাররা ৩০টি উইকেট পেয়েছেন। মোস্তাফিজ, মাশরাফি ও সাইফউদ্দিনের জ্বলে ওঠার দিন। ছোট মাঠই শেষ কথা নয়! তামিম ইকবাল ও মাশরাফি দুদিন কথা বলেছেন। দুজনই মনে করেন, ছোট মাঠে বরং বাংলাদেশের সুবিধা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটসম্যানরা ছোট-বড় সব মাঠেই ছক্কা হাঁকান।

ফলে বাংলাদেশের জন্য বড় মাঠ হলে সমস্যা বেশি। এই মাঠে আরও সুবিধাই হয়েছে বলে মনে করেন মাশরাফি। ক্যারিবীয়রা টি-টোয়েন্টি মেজাজে ব্যাটিং করেন। বেশি আক্রমণ করে খেলতে গিয়ে আবার বিপদেও পড়তে পারে ওয়েস্ট ইন্ডিজÑ ধারণা মাশরাফির। শেষ আশা? ৯ ম্যাচের বিশ্বকাপ। বাংলাদেশ শেষ ৪ ম্যাচ থেকে ৩ পয়েন্ট পেয়েছে। বাকি ৫ ম্যাচ থেকে ৭ পয়েন্ট পেলে সেমিফাইনালের আশা থাকতেও পারে।

বাংলাদেশ যেহেতু সম্প্রতি ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ভালো খেলছে, সেহেতু এই ম্যাচে জ্বলে ওঠা জরুরি। পরে অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও পাকিস্তান কঠিন প্রতিপক্ষ। এই ম্যাচে হেরে গেলে আশা মিইয়ে যাবে শেষ চারের। আর জিতলে পুরো চিত্রই পাল্টে যেতে পারে।

Share.

Leave A Reply