কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দুর্নীতিবাজদের পুরস্কার

0

কার স্বার্থে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকছে। সৎ করদাতাদের চেয়ে অসৎ করদাতারাই বেশি কর সুবিধা পাচ্ছে। এবারের বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধির মতো বড় কোনো ছাড় পাননি সাধারণ করদাতারা। কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেয়ার মাধ্যমে দুর্নীতিবাজদের পুরস্কৃত করা হয়েছে। আর সৎ করদাতাদের প্রতি অন্যায় করা হয়েছে। কোথায় এই কালো আর এর মালিকরা। এদের নাম জানতে চায় জনগণ।
কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া নিয়ে অতীতেও নানা সমালোচনা করা হয়েছে। এবারও সমালোচনা আরও বেশি হয়েছে। কারণ এবার খোদ প্রধানমন্ত্রী এ সুযোগের ঘোষণা দিয়েছেন। কারণ তিনি এবার বাজেটোত্তর সাংবাদিক সম্মেলন করেছেন।
স্বাধীনতার ৪৮ বছরে দেশে মাত্র কালো টাকা সাদা হয়েছে ১৪ হাজার কোটি টাকা। অথচ দেশে কালো টাকা রয়েছে প্রায় ৭লাখ কোটি টাকা। তাহলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে এত টাকার মালিক কারা। তারা কোথায় রেখেছে এ টাকা। তারা কার স্বার্থে কিংবা কার বিপক্ষে এ টাকা ব্যবহার করেন।
অতীতে কালোটাকা সাদা করার সুযোগে খুব বেশি সাড়া পায়নি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবু এই সুযোগ বারবার দেয়া হচ্ছে। ফলে অসৎ করদাতারা সব সময় মনে রাখেন যে কম হারে কর দিয়ে টাকা সাদা করার সুযোগ আসবেই। আর যাই হোক না কেন জেল জরিমানা তো আর হবে না। টাকা নিরাপদেই থাকবে।
প্রস্তাবিত ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে জমি-ফ্ল্যাট ও শিল্প খাতে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে জমি ও ফ্ল্যাটে এলাকাভেদে নির্দিষ্ট পরিমাণ কর দিলেই টাকার উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করবে না এনবিআর। আর অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালোটাকা বিনিয়োগ করা যাবে।
কি আজব দেশ। যে দেশে এক লাখ টাকা ব্যাংকে জমা দিতে গেলেই জানতে চায় এই টাকার উৎস কোথায়। একইভাবে সঞ্চয়পত্র কিনতে এবং এফডিআর করতে গেলেও জানতে চাওয়া হয় টাকার উৎস কোথায়। অথচ কালো টাকা সাদা করতে গেলেও প্রশ্ন করা হবে না এ টাকার উৎস কোথায়। কত বছর এ টাকার কর দেয়া হয়নি। কি কারণে এ টাকার কর দেয়া হয়নি। এ টাকা কিভাবে উপার্জন করা হয়েছে।
কীভাবে অসৎ করদাতারা সুফল পাবেন, এর একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। একজন সৎ করদাতা কষ্ট করে বছর বছর টাকা জমান, সেই টাকার ওপর নিয়মিত কর দিয়ে একটি ফ্ল্যাট বা জমি কেনেন। কিন্তু নির্দিষ্ট পরিমাণ কর দিয়ে একজন অসৎ ব্যক্তি ফ্ল্যাট কিনে ফেলতে পারবেন। ঘুষ, দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত টাকা বছরের পর বছর রিটার্ন ফাইলে লুকিয়ে রাখলেও এখন ফ্ল্যাট বা জমি কিনে ওই টাকা বৈধ করে ফেলতে পারবেন।
আবার অর্থনৈতিক অঞ্চল বা হাইটেক পার্কে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রেও সৎ বিনিয়োগকারীর চেয়ে অসৎ বিনিয়োগকারীরা সুবিধা পাবেন। সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ হারে কর দেওয়ার পর অর্থনৈতিক অঞ্চল বা হাইটেক পার্কে বিনিয়োগ করবেন একজন সৎ উদ্যোক্তা। আর একজন অসৎ ব্যক্তি এত দিন কর না দিয়েও এখন শুধু ১০ শতাংশ কর দিয়ে বিনিয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। এখানেই শেষ নয়, বিনিয়োগ করার পর সৎ ও অসৎ বিনিয়োগকারী একই হারে কর অবকাশ সুবিধাও পাবেন।
দুর্নীতি প্রতিরোধ নিয়ে কাজ করা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক মো. ইফতেখার”জ্জামান এ বিষয়ে বলেন, দুর্নীতিকে সুরক্ষা ও প্রসার ঘটানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এভাবে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া অসাংবিধানিক। প্রধানমন্ত্রী নিজেই বিভিন্ন সময় দুর্নীতির বির”দ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ দেখানোর কথা বলেছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর অবস্থানের সঙ্গে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি সাংঘর্ষিক। তাঁর মতে, কালোটাকা সাদা করায় দুটি বিশেষ উদ্বেগের বিষয় আছে। যাদের অবৈধ আয় আছে, তাঁরা ফ্ল্যাট, জমি, শিল্পকারখানা দখল করে নেবেন। সৎ করদাতারা এসবের মালিক হতে পারবেন না। কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে দুর্নীতিবাজদের পুরস্কৃত করা হয়েছে। আর সৎ করদাতাদের প্রতি অন্যায় করা হয়েছে।
স্বাধীনতার পর প্রায় সব সরকারের আমলেই কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে এতে টাকা সাদা হয়েছে সামান্যই। এ পর্যন্ত প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা সাদা হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি টাকা সাদা হয়েছে ২০০৭ ও ২০০৮ সালের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। ওই সময় ৩২ হাজার ৫৫৮ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এই সুযোগ নিয়েছিল। তখন ৯ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা বৈধ করা হয়, যা এই পর্যন্ত যত টাকা বৈধ হয়েছে, এর অর্ধেকের বেশি।
সাবেক ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ছিলেন এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, এবার কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষের বীজ বপন করে দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের সুযোগ দেওয়া ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আর এবারের সুযোগটির কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। এতে সৎ করদাতারা কর দেওয়ায় নির”ৎসাহিত হবেন।
মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, বলা হচ্ছে, অর্থ পাচার রোধে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সুযোগটি না দিয়ে বরং যারা অর্থ পাচার করেছেন, তাঁদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি দিলে বেশি ভালো হতো।
সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সময়ে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে শুধু ফ্ল্যাট কেনায় কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এবার জমি কেনায় কালোটাকা সাদা করার সুযোগটি যুক্ত করা হয়েছে। আবার ফ্ল্যাট কেনায় করের পরিমাণও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে কত টাকা সাদা হয়েছে, তার কোনো হিসাব এনবিআর প্রস্তুত করেনি।
এবারের বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী, রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা, মতিঝিল ও দিলকুশায় ২০০ বর্গমিটারের কম ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক ভবন কিনলে প্রতি বর্গমিটারে ৪ হাজার টাকা এবং ২০০ বর্গমিটারের বেশি ফ্ল্যাট ও ভবন কিনলে প্রতি বর্গমিটারে ৫ হাজার টাকা কর দিতে হবে। আর জমি কেনার ক্ষেত্রে প্রতি বর্গমিটারে ১৫ হাজার টাকা দিতে হবে। প্রতি বর্গমিটার ৯ বর্গফুট আয়তনের সমান।
একইভাবে ধানমন্ডি, ডিওএইচএস, মহাখালী, লালমাটিয়া, উত্তরা, বসুন্ধরা, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, কারওয়ান বাজার, বিজয়নগর, সেগুনবাগিচা, নিকুঞ্জ, চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ, খুলশী, আগ্রাবাদ ও নাসিরাবাদ এলাকায় ফ্ল্যাট ও ভবন কেনায় ২০০ বর্গমিটারের কম হলে বর্গমিটারপ্রতি ৩ হাজার টাকা, ২০০ বর্গমিটারের বেশি ৫ হাজার টাকা কর হবে। জমি কিনলে প্রতি বর্গমিটারে ১০ হাজার টাকা দিতে হবে।
অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় ফ্ল্যাট ও ভবনে ১২০ বর্গমিটারের কম হলে প্রতি বর্গমিটার ৮০০ টাকা এবং ১২০ থেকে ২০০ বর্গমিটারের মধ্যে ফ্ল্যাট ও ভবনে বর্গমিটারপ্রতি ১ হাজার টাকা কর নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০০ বর্গমিটারের জন্য প্রতি বর্গমিটারে দেড় হাজার টাকা কর আরোপ হবে। ওই সব এলাকায় জমি কিনলে কর পড়বে প্রতি বর্গমিটারে ৫ হাজার টাকা।
দেশের পৌরসভা এলাকায় ১২০ বর্গমিটারের কম হলে ফ্ল্যাট ও ভবন কিনতে গেলে প্রতি বর্গমিটারে ৩০০ টাকা করারোপ হবে। ১২০ থেকে ২০০ বর্গমিটারের মধ্যে ফ্ল্যাট ও ভবনে বর্গমিটারপ্রতি ৫০০ টাকা কর নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০০ বর্গমিটারের জন্য প্রতি বর্গমিটারে ৭০০ টাকা কর আরোপ হবে। এ ছাড়া ওই সব এলাকায় জমি কিনলে কর দিতে হবে প্রতি বর্গমিটারে ১ হাজার টাকা। অন্য এলাকায় ফ্ল্যাট ও ভবন কেনায় প্রতি বর্গমিটারে আয়তনভেদে ২০০-৫০০ টাকা দিতে হবে।
স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত সরকারগুলো ১৬ বার কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দিলেও এতে টাকা সাদা হয়েছে সামান্যই। দেশে প্রথম কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল ১৯৭৫ সালে, সামরিক আইনের আওতায়। এরপর ১৯৭৭-৭৮ অর্থবছরে সে সময়ের রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দিলে মাত্র ৭০ কোটি টাকা সাদা হয়েছিল এবং তাতে সরকার পায় সাড়ে ১০ কোটি টাকার রাজস্ব। ১৯৮১-৮২ অর্থবছরের বাজেটে আবারও কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হলেও তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি।
১৯৮২ সালের সামরিক আইন অনুযায়ী, ১৫ শতাংশ কর দিয়ে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেন জেনারেল এরশাদ। ১৯৮৭-৮৮ অর্থবছরের বাজেটে আবার ২০ শতাংশ আয়কর দিয়ে অর্থ সাদা করার সুযোগ দিলে মাত্র ২০০ কোটি টাকা সাদা হয় এবং সরকার রাজস্ব পায় ৪০ কোটি টাকা। এরপর ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরে ২৫০ কোটি টাকা সাদা হয় এবং সরকার আয় করে ২৫ কোটি টাকা। আর ১৯৮৯-৯০ অর্থবছরে ৪০০ কোটি টাকা সাদা হয়, সরকার কর পায় ৪০ কোটি টাকা। এরশাদ সরকারের পতনের পর বিএনপি ক্ষমতায় আসে। ওই পাঁচ বছরে এ ধরনের সুযোগ দেওয়া হয়নি।
১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগের সময় প্রায় প্র্রতিবছরই নানাভাবে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়। ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরের বাজেটে বলা হয়েছিল, কেউ নতুন শিল্পে বিনিয়োগ করলে কোনো প্রশ্ন করা হবে না। আর সাড়ে ৭ শতাংশ হারে কর দিলে কর অবকাশ–সুবিধা দেওয়া হবে। তবে এই সুযোগ তেমন কেউ গ্রহণ করেননি।
১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরের বাজেটে অভিনব কিছু উপায়ে আবার কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। ওইবারই প্রথম কর দিলে বিলাসবহুল গাড়ি ও ফ্ল্যাট কিনলে আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন না করার ঘোষণা দেওয়া হয়। ২০০০-০১ সালের বাজেটে ১০ শতাংশ হারে আয়কর দিয়ে কালোটাকা সাদা করার সুযোগও রাখা হয়। এতে সব মিলিয়ে ১ হাজার কোটি টাকা সাদা হয়েছিল। আর সরকার রাজস্ব পায় ১০০ কোটি টাকা।
২০০১ সালে বিএনপি আবারও ক্ষমতায় এলে সেবার শর্তহীনভাবে বিভিন্ন খাতে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেয়। এমনকি এ জন্য কোনো করও নির্ধারণ করা হয়নি। ২০০২–এর জুলাই থেকে ২০০৫–এর জুন পর্যন্ত সময়ে প্রায় ১ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা সাদা হয়। আর এই সুযোগ নিয়েছিলেন ১ হাজার ৭৭ জন।
কিন্তু ২০০৫-০৬ অর্থবছরের বাজেটে সাদা করতে সাড়ে ৭ শতাংশ হারে কর নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। এই সুযোগ নিয়েছিলেন ৭ হাজার ২৫২ জন। আর সাদা হওয়া অর্থের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। আর সরকার কর পায় ৩৪৫ কোটি টাকা।
আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর আবারও বাজেটের মাধ্যমে কালোটাকা সাদা করার সব ধরনের সুযোগ দেয়। এ সময় ১ হাজার ৯২৩ জন এই সুযোগ নিয়ে ৯২২ কোটি ৯৮ লাখ ৮ হাজার ৯৭২ টাকা বৈধ করেছিলেন।

Share.

Leave A Reply