জনতার পুলিশ, তুমি বন্ধু হবে কবে?

0

সুনসান রজনী, জনশূন্য রাজপথ। দূরে কোথাও কুকুরের ডাক আর মাঝে মাঝে টহল পুলিশের বাঁশি… আর এভাবেই আমরা কুকুরের সঙ্গে রাত জেগে আপনাদের নিরাপত্তা দেই। কথাগুলো শুনেছিলাম একজন পুলিশ বন্ধুর কাছ থেকে একটি প্রশিক্ষণের ফাঁকে আলাপচারিতায়। তার নাম রাসেল শেখ। চমৎকার তার বাচনভঙ্গি, শব্দ চয়নে মুন্সিয়ানা এবং মেধাবী দৃষ্টিসম্পন্ন সেই ছেলেটির কথা এখনো কানে বাজে। আপ্লুত হয়েছিলাম, ধন্যবাদ জানিয়েছিলাম সেদিন। বলেছিলাম এই রাসেলরাই একদিন ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হয়ে পুলিশের মুখ উজ্জ্বল করবে…।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে রামুতে একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনায় পতিত হলে ঘটনাস্থলেই চারজন নিহত হয়েছিল সেদিন। বাসের নিচে আটকে পড়েছিল ছোট্ট একটা মেয়ে। কী তার পরিচয়, কেউ জানে না। একটি তরুণ এগিয়ে এসে উদ্ধার করলেন, চিৎকার করে কাঁদলেন মেয়েটিকে বুকে চেপে আর ছুটলেন হসপিটালের দিকে। লোকটির নাম শের আলী, তিনি চট্টগ্রামের ডিবি পুলিশে কর্মরত। সম্পূর্ণ অচেনা একটি মানব শিশুকে উদ্ধার করে মন জয় করেছেন কোটি মানুষের। সাদা পোশাকে বিশ্রামে থেকেও মানবতার ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন তিনি…।

কুমিল্লার দাউদকান্দিতে একটি যাত্রীবাহী বাস রাস্তার পাশে খাদের পানিতে ডুবে যাচ্ছিলো, ব্যস্ত জনপথে সকলের চোখের সামনে। সেখানে পারভেজ মিয়া নামে একজন পুলিশের কনস্টেবল ছিলেন। দ্রুত ঠিক করে নিলেন কি করা উচিৎ একজন মানুষ এবং জনগণের বন্ধু হিসেবে। ঝাঁপিয়ে পড়লেন নোংরা পানিতে। ডুবন্ত বাসের জানালার কাঁচ ভেঙে ৪০ জন যাত্রীকে উদ্ধার করেছেন তিনি একা। যার মধ্যে ছিলেন ২৫ জন নারী এবং ৭ মাসের একটি শিশু। এই কাজ তার ছিলো না, তবে মানবসেবার এই সুযোগ তিনি হাতছাড়া করেননি। বলতে গর্ব হয়, তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা পিতার সন্তান…।

সময়মতো পরীক্ষা হবে কি না সংশয় দেখা দিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত হওয়া সাতটি কলেজের ছাত্ররা রাজপথে নেমে আসে। সিদ্দিকুর রহমান ছিলো সেই মিছিলে, পুলিশ বাঁধা দেয়। তারুণ্যের বাঁধ কখনোই টিয়ার শেল কিংবা বুলেটে রুদ্ধ হয়নি, এবারো হলো না। চোখ হারিয়ে সময়মতো পরীক্ষার দাবি আদায় করে দিয়েছে সিদ্দিকুর। সরকার যদিও তাকে একটি চাকরি দিয়ে পুনর্বাসন করার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু আমরা বঞ্চিত হয়েছি ন্যায়বিচার থেকে। সেলিম-দেলোয়ার-দিপালী সাহা-ডা. মিলনসহ অগণিত মৃত্যুর জন্য দায়ী ভাবা হয় পুলিশকে। কেন? এই সবই কি অপপ্রচার? এতে আম জনতার লাভ কী?

একবার খেলার মাঠে একজন সিনিয়র ফটো সাংবাদিককে ঘুষি দিয়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছিলেন পুলিশের এক বড় কর্তা। সম্প্রতি বরিশালে একজন সাংবাদিক ডিবি পুলিশের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন বলে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে তোলপাড় হচ্ছে এখনো…।

ঠিক এমনি সময় আসামি ধরতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ডিবি পুলিশের পরিদর্শক জালাল উদ্দীন। রক্তক্ষয়ী হলি আর্টিজান বেকারি থেকে জিম্মিদের উদ্ধার করতে গিয়ে জীবন দিয়েছেন দুইজন পুলিশ পরিদর্শক।

যখন নিরাপত্তা হেফাজতে কেউ মৃত্যুবরণ করেন, যখন একজন শিক্ষার্থীর পিঠে লাঠি, বুট কিংবা টিয়ার সেল ছোড়া হয়, আমরা ব্যথিত হই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীর পায়ে চাপাতি দিয়ে আঘাত দিয়েছিল কে? লিমনের পায়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করেছিল কে? দিনাজপুরের শিশু ইয়াসমিনকে ধর্ষণ করে হত্যা করেছিলো কে? সকল প্রশ্নের উত্তর আমাদের মতো সাধারনণ মানুষ জানে, কিন্তু উচ্চারণ করতে ভায় পায়।

পাসপোর্ট করা মানেই দেশত্যাগ নয়। এই পাসপোর্ট করতে গিয়েও পয়সা দিতে হয়, এ বড় লজ্জার কথা! অস্থায়ী ঠিকানা ঢাকা আর স্থায়ী জেলা শহরে, তাই দুই জায়গায় ভেরিফিকেশনের নামে চা পানের অর্থ দিতে হয়। তারা আবেদনকারীর আবাসস্থল পরিদর্শন করে না, খতিয়ে দেখে না অতীত ইতিহাস। এই যাচেইয়ের নামে কালক্ষেপণ এবং অবৈধ অর্থ আদায় কিভাবে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করে? পাসপোর্ট বাবদ সরকারের কোষাগারে বাড়তি ট্যাক্স/ভ্যাট দিতে হয় ৪৫০ টাকা, কিন্তু দুই জেলার রাষ্ট্রীয় সংস্থার দুই সদস্যকে দিতে হয়ে ৫০০+৫০০=১০০০ টাকা নূন্যতম। তারা সংখ্যায় খুব বেশি বলে আমি মনে করি না। তবে তাদের অপকর্মের দায় গোটা বাহিনী বহন করতে বাধ্য হচ্ছে।

সম্প্রতি একজন ছাত্রনেতা মৃত্যুবরণ করেছেন নিরাপত্তা হেফাজতে, অনেক প্রশ্ন জন্ম দিয়ে। একসময় তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্রকে নির্দয়ভাবে অত্যাচার করা হয়েছিল। এমনকি নগ্ন করে তার সন্তানতুল্য সাঁওতালদের সামনে আনা হয়েছিল, তাদের মনোবল ভেঙে দেয়ার জন্য। সময় বদলে গেছে অনেক, তারপরেও কি আমরা এই পুলিশই দেখবো? এমন বন্ধু কি আমরা ভুল করেও চেয়েছিলাম?

পুলিশ বাহিনী অগণিত সীমাবদ্ধতা নিয়ে তারা কাজ করেন। এই কিছুদিন আগেও রাজনৈতিক আন্দোলন মোকাবেলা করতে হয়েছে আমাদের পুলিশ বাহিনীকেই। তারা রক্তাক্ত হয়েছেন, কোথাও কোথাও তারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। চরাঞ্চলে সর্বহারা অধ্যুষ্যিত এলাকায় এমনকি জঙ্গিদের হাতেও প্রাণ দিয়েছেন অগনিত পুলিশ। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে পরিবার ছাড়া বেদুঈন জীবন তাদের, ঘুমানোর পর্যাপ্ত সুযোগ এমন কি রাজপথে স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েও তারা সেবায় নিয়োজিত আছেন, সাধারণ পুলিশের খাবার আমরা না কি মুখেই নিতে পারবো না। আমরা খুব সহজেই হয়তো তাদের দিকে আঙ্গুল তুলতে পারি। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কতক্ষণ দায়িত্ব পালন করতে পারবো আমি বা আপনি, ভেবছেন কখনো…।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে ২৫ মার্চ ঢাকার রাজপথে অপারেশন সার্চলাইট শুরু হলে প্রথমেই আক্রান্ত হয় রাজারবাগ পুলিশ লাইন। কামানের গোলার সামনে সামান্য থ্রি নট থ্রি হাতে প্রতিরোধ গড়ে তোলে বাঙালি পুলিশ সদস্যরা। রাত সাড়ে এগারোটা থেকে ভোর সাড়ে তিনটা পর্যন্ত যুদ্ধ হয়েছে, পুলিশ ভাইদের রক্তে রাজারবাগ রঞ্জিত হয়েছে, তবুও পরাজয় মেনে নেয়নি। মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রায় ১৪ হাজার সদস্য অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে। নিরস্ত্র বাঙালিদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন এবং ৭৩৯ জন মুক্তিযোদ্ধা পুলিশ শহীদ হয়েছেন।

পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাওয়া শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পুলিশ সদস্যদের তালিকায় দেখা যায়, ঢাকা জেলা পুলিশের ৫০ জন, রিজার্ভ পুলিশের ১৪০ জন, ফরিদপুর জেলায় চার জন, ময়মনসিংহে ২৩ জন, টাঙ্গাইলে ছয় জন, এআইজি টেলিকম ঢাকা অফিসের সাত জন, সিআইডি ঢাকার দুই জন, দুর্নীতি দমন সংস্থায় প্রেষণে কর্মরত তিন জন, চট্টগ্রাম জেলার ৭১ জন, পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার ২৩ জন, কুমিল্লার ২৫ জন, নোয়াখালীর ৯ জন, সিলেটের ১৩ জন, রাজশাহী রেঞ্জ অফিসের তিন জন, রাজশাহী জেলার ৬০ জন, রংপুর জেলার ২৩ জন, বগুড়া জেলার ২১ জন, পাবনা জেলার ৩০ জন, দিনাজপুরের ২১ জন, সারদা পুলিশ একাডেমির ৩৯ জন, খুলনা জেলার ৭০ জন, কুষ্টিয়া জেলার ৩৩ জন, বাখেরগঞ্জ জেলার (বর্তমানে বরিশাল) ১৪ জন, পটুয়াখালীর ছয় জন, চট্টগ্রাম রেলওয়ে পুলিশের ৪৩ জন পুলিশ সদস্য শহীদ হয়েছেন।

অযাচিত ক্রস ফায়ার, নিরাপত্তা হেফাজতে অনাকাঙিক্ষত মৃত্যু, তদন্তে দীর্ঘ সময়, অভিযানে হয়রানি, অনর্থক অর্থ দাবি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং পুলিশ কর্তৃক যাবতীয় অন্যায়ের প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে। এই ধরনের প্রতিবাদ আমাদের (জনতা-পুলিশ) সামজিক বন্ধনকে কখনোই সুদৃঢ় করবে না। পুলিশ ভালো কাজ করলেও আমরা বাঁকা চোখে তাকাই, নিশ্চয়ই কোন মতলব আছে। বদ মতলব থাকুক, তার পরেও নাগরিক হিসেবে আমাদের কিছু দায় আছে। পুলিশকে নাড়া দিতে হবে, তাদের ভালো কাজের প্রশংসা করতে হবে, তাদের ভেতরের ভালো মানুষ সত্ত্বাকে জাগিয়ে তুলতে হবে…।

তিন দিন আগে গত হলো রক্তাক্ত ২৫ মার্চ। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রতিরোধের ৪৭ বছর পর বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীকে জানাচ্ছি শ্রদ্ধা এবং অভিনন্দন। দুই একটি দুষ্টু মানুষের দায় গোটা বাহিনী বহন করতে পারে না। যতদ্রুত পুলিশ জনগণের প্রকৃত বন্ধু হবেন, তত দ্রুত সমাজে শান্তি ফিরে আসবে, তখন জনতাই হবে পুলিশ…।

জনতার পুলিশ, তুমি বন্ধু হও…।

অনুপম মাহমুদ: উন্নয়ন ও অধিকারকর্মী

সূত্রঃ ঢাকা টাইমস ২৪ ডটকম

Share.

Leave A Reply