মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়া'র স্মৃতি কেন্দ্রটি অবহেলিত আর পৈত্রিক ভিটা বেদখল

0
ডেস্ক রির্পোট★ উপমহাদেশের নারী জাগরণের অগ্রদূত মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়া ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।  রোকেয়ার আদর্শ, কর্ম ও জীবন সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে অবহিত করার পাশাপাশি তার স্মৃতি এবং অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে রোকেয়ার জন্মভূমি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে নির্মিত হয় বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্র। স্মৃতি কেন্দ্রটি একযুগেরও বেশি সময় ধরে অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে, যে লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যে স্মৃতি কেন্দ্রটি চালু হয়েছে সেই লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জানা যায়, ৯ ডিসেম্বর বেগম রোকেয়ার জন্ম ও প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে ১৯৭৪ সাল থেকে পায়রাবন্দবাসী রোকেয়াকে স্মরণ করে রোকেয়া দিবস পালন করে আসছেন। সরকারিভাবে ১৯৯৪ সাল থেকে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে বেশ ঘটা করেই দিবসটি পালন করা হয়। সেই সঙ্গে পায়রাবন্দে ৯-১১ ডিসেম্বর রোকেয়া মেলা বসে। সেখানে তিনদিনব্যাপী আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। এভাবে মেলাকেন্দ্রিক চক্রাকারে ঘুরছে রোকেয়া দিবস। কিন্তু এলাকাবাসীর দাবী এখানে এ ধরণের মেলা না করে যদি রোকেয়া দিবস উপলক্ষে তিনদিনব্যাপী বইমেলার আয়োজন করা যেতো তাহলে মেলায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বইপ্রেমীদের ভিড় বেশি হতো।
রোকেয়ার পৈত্রিক ভিটা বেদখল
পায়রাবন্দে বেগম রোকেয়ার পিতার ৩৫০ বিঘার উপরে সম্পত্তি ছিল। কিন্তু তার নামে এখন এক শতক জমিও নেই। বর্তমানে স্মৃতিকেন্দ্রটি ৩.১৫ বিঘা জমির উপর রয়েছে। রোকেয়ার পৈত্রিক জমি উদ্ধারে হাইকোর্টে একটি রিট মামলা চলমান রয়েছে। এলাকাবাসী দাবি করেন, রোকেয়ার পারিবারিক যে মসজিদটি রয়েছে সেটি পুরনো আদলে নির্মাণ, রোকেয়ার বাস্তুভিটার ধ্বংসাবশেষ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে সংস্কার, একটি পর্যটন কেন্দ্র, রোকেয়া দিবস উপলক্ষে সাধারণ মেলার পরিবর্তে তিনদিনব্যাপী বইমেলার আয়োজন করার দীর্ঘদিনের দাবি থাকলেও এব্যাপারে সরকারের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। বিশেষ করে জেলা প্রশাসন এ ব্যাপারে একেবারেই উদ্যোগহীন বলে দাবি করেন এলাকাবাসী।
৫৩ বছরেও সরকারি হয়নি বেগম রোকেয়া মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
বেগম রোকেয়ার পৈত্রিক ভিটায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি কলেজ সরকারি হলেও প্রতিষ্ঠার ৫৩ বছর পরেও বেগম রোকেয়া মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়টি সরকারি হয়নি। এটি ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এলাকাবাসী বলেন, ‘বেগম রোকেয়ার নামে পৈত্রিক ভিটায় অবস্থিত একটি বালিকা বিদ্যালয় সরকারি না হওয়া বেগম রোকেয়ার প্রতি আমাদের উদাসীনতারই বহি:প্রকাশ।’
স্মৃতিকেন্দ্রে কর্মরত কর্মচারীরা বেতন পান না ১৪ বছর
প্রায় তিন কোটি ৭৮ লাখ ৭৯ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্মৃতিকেন্দ্রটির উদ্বোধন করা হয় ২০০১ সালের ১ জুলাই। কিন্তু একই বছরের ১৩ অক্টোবর তৎকালীন সরকার স্মৃতিকেন্দ্রের সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। এরপর ২০০৪ সালের জুলাই থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয় উপপরিচালকসহ ১৩ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা। ইতোমধ্যে ওই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুইজন বেতন-ভাতা পেলেও অনেকেই অন্যত্র চলে গেছেন। বাকি পাঁচ কর্মচারী বেতন-ভাতা না পেলেও সেখানেই পড়ে আছেন।
এদিকে দীর্ঘদিন বেতন-ভাতা না পাওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন কর্মচারীরা। জানতে চাইলে বেতন বঞ্চিত কর্মচারী আব্দুল বাতেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে একই কথা বলে যাচ্ছি, কিন্তু কোন কাজ হচ্ছে না। বাবা-মা, ছেলে-মেয়েকে নিয়ে কোন রকমেও দিন পার করতে পারছি না। বাবার যেটুকু জমি পেয়েছিলাম তাও বিক্রি করে দিতে হয়েছে। রোকেয়াকে ভালোবাসি বলে তার স্মৃতিকেন্দ্রকে ছেড়ে কোথাও যেতেও পারি না।’ 
বেগম রোকেয়া স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল বলেন, ‘আমরা বেগম রোকেয়ার দর্শন ও আদর্শ বাস্তবায়ন করে রোকেয়াকে আমাদের মাঝে বাঁচিয়ে রাখতে পারি। রোকেয়ার শেষ স্মৃতি তার পৈত্রিক ভিটা-বাড়ির ধ্বংসাবশেষ। আর এটি এখনই সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে দু-তিন বছরের মধ্যেই মুছে যাবে। তাই রোকেয়ার স্মৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার জন্য হলেও সরকারকে এগুলো সংরক্ষণের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।’
স্মৃতিকেন্দ্রটির উপ-পরিচালক আব্দুল্যাহ আল ফারুক জানান, কখনও কোন স্কুল নিজের চোখেও দেখেননি বেগম রোকেয়া। তারপরেও তিনি তার যে আদর্শ আমাদের জন্য রেখে গেছেন তা বাস্তবায়ন করলে শুধুমাত্র নারীরাই যে উপকৃত হবে তা নয়, বরং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল মানুষ আলোকিত হবে, আদর্শবান হবে। এজন্য রোকেয়া চর্চা এবং তার আদর্শ বাস্তবায়নে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
Share.

Leave A Reply